প্রিন্ট এর তারিখ : ১০ জুলাই ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১০ জুলাই ২০২৬
ভারতে নির্বাসনে থাকা শেখ হাসিনার ঘোষণা: ‘ডিসেম্বরে দেশে ফিরব, আদালতে আত্মসমর্পণ করব
||
মোহাম্মদ আলী সুমনভারতে নির্বাসনে থাকা বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা জানিয়েছেন, চলতি বছরের ডিসেম্বরের দিকে তিনি এবং তার দলের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা স্বেচ্ছায় বাংলাদেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণ করার পরিকল্পনা করছেন। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্স-কে দেওয়া প্রায় এক ঘণ্টাব্যাপী এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা জানান।৭৮ বছর বয়সী শেখ হাসিনা বলেন, দেশে ফিরলে তাকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে, এমনকি হত্যারও আশঙ্কা রয়েছে। তবুও তিনি নিজের জন্মভূমিতেই ফিরে যেতে চান।তার ভাষায়, “আমাকে দেশে ফিরেই গ্রেপ্তার করা হতে পারে, এমনকি হত্যা করা হলেও অবাক হব না। তারপরও আমাকে ফিরতেই হবে। আমার দলের নেতাকর্মীরা ভয়াবহ দমন-পীড়নের শিকার হচ্ছেন। মৃত্যু যদি আসেই, তবে আমি চাই সেটা আমার নিজের মাটিতেই আসুক-যেখানে আমার বাবা-মায়ের কবর এবং যেখানে তাদের রক্ত মিশে আছে।২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেন। পরবর্তীতে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গত নভেম্বরে ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে প্রাণঘাতী অভিযান পরিচালনার অভিযোগে অনুপস্থিত অবস্থায় তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। তবে নির্বাসনে থেকেই তিনি এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন।রয়টার্সকে শেখ হাসিনা জানান, তিনি কিংবা তার দলের নেতাদের দেশে ফেরার বিষয়ে কোনো বিদেশি সরকারের সঙ্গে আলোচনা করেননি। বাংলাদেশ সরকার ভারতকে একাধিকবার তাকে প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানিয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। তবে তিনি বলেন, “তারা আমাকে ফেরত নিতে চায়, বারবার ভারতকে চিঠি দিচ্ছে। কিন্তু আমি নিজেই স্বেচ্ছায় দেশে ফিরব।রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাসনে যাওয়ার পর এই প্রথম শেখ হাসিনা সরাসরি কোনো আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে সাক্ষাৎকার দিলেন এবং প্রথমবারের মতো দেশে ফেরার সম্ভাব্য সময়সীমাও প্রকাশ করলেন। তিনি জানান, তার সঙ্গে আওয়ামী লীগের আরও কয়েকজন শীর্ষ নেতাও দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন। তাদের মধ্যে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের নামও উল্লেখ করা হয়েছে, যিনি একই মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত।তবে ঠিক কোন তারিখে তিনি দেশে ফিরবেন, কিংবা কোন আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন—সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য দেননি শেখ হাসিনা।তিনি বলেন, “আমি বিচার ব্যবস্থার ওপর বিশ্বাস রাখি। বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু হলে মানুষ নিজেরাই বুঝতে পারবে এই বিচার কতটা প্রহসনমূলক। আমি সেটিই প্রমাণ করতে চাই।বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক মামলা, গ্রেপ্তার এবং হামলার অভিযোগ তুলে শেখ হাসিনা বলেন, দলের প্রায় সব পর্যায়ের নেতাকর্মীর বিরুদ্ধেই মামলা হয়েছে এবং অনেকেই আত্মগোপনে রয়েছেন। তাই সবাইকে একসঙ্গে দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে দেশে ফেরার বিষয়ে কোনো ধরনের গোপন আলোচনা হয়নি বলেও জানান সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী। তার ভাষায়, গণতন্ত্র, ভোটাধিকার, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অধিকার কিংবা ন্যায়বিচার-এসব গোপন আলোচনার বিষয় নয়।কারাগারে যাওয়ার আশঙ্কা নিয়েও তিনি উদ্বিগ্ন নন বলে জানান। অতীতের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে বলেন, সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনের সময় একাধিকবার কারাবরণ করেছেন তিনি। ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দুর্নীতির মামলায় গ্রেপ্তার হওয়ার পর মুক্তি পেয়ে ২০০৮ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে পুনরায় ক্ষমতায় ফিরেছিলেন।২০২৪ সালে দেশত্যাগের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, গণভবনের দিকে বিক্ষুব্ধ জনতার অগ্রযাত্রার সময় তার জীবনের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে, যার কারণে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন।দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার বিষয়ে আত্মসমালোচনার সুরে তিনি বলেন, “কোনো সরকার দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকলে ভুল হতেই পারে। পৃথিবীর কোনো সরকারই ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। কিন্তু কোনটা ভালো, কোনটা খারাপ-সেটির বিচার করার অধিকার জনগণের। সেই বিচার আমি জনগণের ওপরই ছেড়ে দিলাম।আওয়ামী লীগের বর্তমান সাংগঠনিক কার্যক্রম সম্পর্কে শেখ হাসিনা জানান, তিনি অনলাইনের মাধ্যমে বাংলাদেশের ৩০০ সংসদীয় আসনের মধ্যে অন্তত ১২৫টি আসনের নেতাকর্মীদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন এবং দলকে পুনর্গঠনের কাজ চলছে।তিনি আরও বলেন, “আমাকে দণ্ড দেওয়া হয়েছে, হয়তো আমি ভবিষ্যতে নির্বাচনে অংশ নিতে পারব না। কিন্তু তাই বলে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা হবে কেন? যদি আমরা খারাপ কাজ করে থাকি, তাহলে জনগণই আমাদের প্রত্যাখ্যান করবে। সেই সিদ্ধান্ত জনগণের হাতেই থাকা উচিত।উল্লেখ্য, শেখ হাসিনার এই বক্তব্যের বিষয়ে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। একইভাবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও রয়টার্সের মন্তব্যের অনুরোধের জবাব দেয়নি। তবে এর আগে ভারত জানিয়েছিল, বাংলাদেশের প্রত্যর্পণ অনুরোধ তারা পর্যালোচনা করছে এবং একই সঙ্গে বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে গঠনমূলক সম্পর্ক বজায় রাখতে আগ্রহী।
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত আর এন টিভি