দাউদকান্দি (কুমিল্লা) প্রতিনিধি: রজত সাহা
কুমিল্লার দাউদকান্দিতে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, ভক্তি, শ্রদ্ধা ও উৎসবমুখর পরিবেশের মধ্য দিয়ে আজ মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) অনুষ্ঠিত হচ্ছে ঐতিহ্যবাহী শ্রীশ্রী মনসা পূজা। এ বছর পূজাটি ২০১তম বছরে পদার্পণ করায় স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে বিরাজ করছে বাড়তি উৎসাহ-উদ্দীপনা। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই ধর্মীয় আয়োজন এবারও নানা আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে উদযাপিত হচ্ছে।
দাউদকান্দি পৌর এলাকার সাহাপাড়ায় স্বর্গীয় নারায়ণ সাহার বাড়িতে আয়োজিত এবারের মনসা পূজার আয়োজন করেছে হরিপদ মেম্বার বাড়ি পূজা মণ্ডপ। পূজাকে ঘিরে সকাল থেকেই মণ্ডপ এলাকায় ভক্ত ও দর্শনার্থীদের আনাগোনা শুরু হয়। সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পূজামণ্ডপ ও আশপাশের এলাকায় উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে।
পূজার শুরুতে ধর্মীয় রীতি ও বিধি-বিধান অনুসরণ করে দেবী মনসার পূজা-অর্চনা, অঞ্জলি, প্রার্থনা ও নৈবেদ্য নিবেদন করা হয়। ভক্তরা দেবীর কাছে নিজেদের পরিবার, স্বজন ও সমাজের শান্তি, মঙ্গল, সুস্বাস্থ্য ও সমৃদ্ধির জন্য প্রার্থনা করেন। অনেক ভক্ত দূর-দূরান্ত থেকে এসে পূজায় অংশ নেন এবং দেবীর আশীর্বাদ কামনা করেন।
২০১ বছরের ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা
আয়োজকদের মতে, এই মনসা পূজা শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; এটি স্থানীয় সনাতন সম্প্রদায়ের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও পারিবারিক বন্ধনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ২০১ বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে চলে আসা এই পূজাকে ঘিরে স্থানীয় মানুষের আবেগ ও আন্তরিকতা রয়েছে। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে অনেক কিছু বদলে গেলেও ঐতিহ্যবাহী এই পূজার আয়োজন ধরে রেখেছেন স্থানীয়রা।
প্রতি বছর পূজার সময় পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও এলাকার বিভিন্ন বয়সী মানুষ একত্রিত হন। ফলে পূজাকে কেন্দ্র করে তৈরি হয় সামাজিক মিলনমেলা। নতুন প্রজন্মের অনেকেই পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠদের কাছ থেকে এই পূজার ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে পারে এবং সেই ধারাবাহিকতা ধরে রাখার আগ্রহ প্রকাশ করে।
ভক্তদের প্রার্থনায় শান্তি ও মঙ্গল কামনা
মনসা পূজায় দেবীর কাছে ভক্তদের অন্যতম প্রধান প্রার্থনা থাকে পরিবার ও সমাজের শান্তি, কল্যাণ ও মঙ্গল কামনা। পূজামণ্ডপে এসে ভক্তরা শ্রদ্ধার সঙ্গে দেবীর সামনে প্রণাম ও অঞ্জলি প্রদান করেন। কেউ কেউ মানত পূরণ ও পারিবারিক মঙ্গল কামনায় পূজায় অংশ নেন।
পূজাকে ঘিরে মণ্ডপ এলাকায় ধর্মীয় পরিবেশ বজায় রাখতে আয়োজকদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ভক্তদের সুবিধার্থে পূজার আনুষ্ঠানিকতা সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পূজা শেষে ভক্তদের মধ্যে প্রসাদ বিতরণেরও আয়োজন রয়েছে।
স্থানীয়দের মধ্যে উৎসবের আমেজ
মনসা পূজাকে কেন্দ্র করে সাহাপাড়া ও আশপাশের এলাকায় উৎসবের আবহ তৈরি হয়েছে। পূজামণ্ডপ সাজানো হয়েছে নানা উপকরণে। দেবী মনসার প্রতিমা ও পূজামণ্ডপের সাজসজ্জা দেখতে বিভিন্ন বয়সী মানুষ সেখানে ভিড় করছেন।
বিশেষ করে শিশু-কিশোর ও তরুণদের মধ্যে পূজাকে ঘিরে দেখা গেছে ব্যাপক উৎসাহ। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে অনেকেই পূজামণ্ডপে এসে ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা উপভোগ করছেন। দীর্ঘদিনের এই ঐতিহ্যকে ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে তৈরি হয়েছে সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের পরিবেশ।
আয়োজকরা জানান, ধর্মীয় রীতি-নীতি যথাযথভাবে অনুসরণ করে পূজার সব কার্যক্রম সম্পন্ন করা হচ্ছে। ভক্তদের অংশগ্রহণ ও সহযোগিতায় এবারের ২০১তম মনসা পূজাও সুন্দর ও সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন হবে বলে তারা আশাবাদী।
ঐতিহ্য সংরক্ষণের আহ্বান
স্থানীয় সচেতন মহল মনে করেন, শত বছরের পুরোনো ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যগুলো শুধু একটি সম্প্রদায়ের নয়, বরং এলাকার সামগ্রিক ইতিহাস ও সংস্কৃতির অংশ। তাই নতুন প্রজন্মের কাছে এসব ঐতিহ্যের ইতিহাস তুলে ধরা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য তা সংরক্ষণ করা প্রয়োজন।
২০১তম বছরে পদার্পণ করা এই মনসা পূজা সেই ঐতিহ্য সংরক্ষণেরই একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ভক্তি, শ্রদ্ধা, সম্প্রীতি ও সামাজিক বন্ধনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত এই পূজা স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।
পূজাকে ঘিরে আয়োজকদের পক্ষ থেকে সকল ভক্ত ও দর্শনার্থীকে স্বাগত জানানো হয়েছে। ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও আনন্দঘন পরিবেশের মধ্য দিয়ে মা মনসার আরাধনার মাধ্যমে সকলের জীবনে শান্তি, সুখ ও সমৃদ্ধি কামনা করেছেন আয়োজকরা।
স্থান: স্বর্গীয় নারায়ণ সাহার বাড়ি, সাহাপাড়া, দাউদকান্দি, কুমিল্লা।
আয়োজনে: হরিপদ মেম্বার বাড়ি পূজা মণ্ডপ।
মতামত