জিএম নজরুল ইসলাম
রাজশাহীর পুঠিয়ায় মোবাইল ফোন ও নগদ টাকা চুরির ‘সন্দেহের’ বশে পরিবারের শাসনের মুখে তীব্র অভিমান করে আব্দুর রহমান শাওন (১৬) নামের এক কিশোর গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছে। সালিশে বসার আগেই ঘটা এই মর্মান্তিক মৃত্যু এলাকায় গভীর শোকের পাশাপাশি নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
ঘটনাটি ঘটেছে গত রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) বিকেলে পুঠিয়া উপজেলার শিলমাড়িয়া ইউনিয়নের উদনপাড়া গ্রামে। নিহত শাওন ওই গ্রামের দরিদ্র অটোচালক মো. শান্টু আলীর ছেলে।
যেভাবে সূত্রপাত:
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) একই এলাকার মো. লিটনের একটি মোবাইল ফোন ও কিছু নগদ টাকা হারিয়ে যায়। এ ঘটনায় লিটন স্থানীয় কিশোর শাওনকে সন্দেহ করেন এবং তার বাবা শান্টু আলীকে বিষয়টি জানান। পরদিন রোববার সকালে শাওনের মা-বাবা পারিবারিকভাবে তাকে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ ও শাসন করেন। পরবর্তীতে স্থানীয়ভাবে সালিশে বসে বিষয়টি মীমাংসার কথা ছিল। কিন্তু সালিশে বসার আগেই রোববার বিকেল ৩টার দিকে বাড়ির পাশের একটি আমবাগানে গাছের ডালের সঙ্গে নাইলনের দড়ি পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করে শাওন।
পরিবার ও স্থানীয়দের প্রতিক্রিয়া:
শাওনের বাবা শান্টু আলী জানান, অটো চালিয়ে কোনোমতে সংসার চালান তিনি। চুরির অভিযোগে শাসন করার পর শাওনের মধ্যে তীব্র মানসিক চাপ তৈরি হতে পারে। তবে শাওন সত্যিই ওই চুরিটির সঙ্গে জড়িত ছিল কি না, সে বিষয়ে পরিবার বা অন্য কেউ নিশ্চিত কোনো তথ্য দিতে পারেনি।
স্থানীয়দের ক্ষোভ ও আক্ষেপ, সামান্য একটি মোবাইল ফোন বা টাকা চুরির ঘটনা নিয়ে অপ্রাপ্তবয়স্ক এক কিশোরকে তাৎক্ষণিকভাবে দোষী সাব্যস্ত না করে বিষয়টি আরও সংবেদনশীলভাবে মোকাবিলা করা যেত। গ্রাম্য সালিশের অপেক্ষায় না থেকে কিংবা সত্যতা যাচাই না করে কঠোর আচরণ করায় শাওনের মতো তাজা একটি প্রাণ অকালেই ঝরে গেল। সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা মনে করছেন, শিশু-কিশোরদের মনস্তত্ত্ব, আত্মসম্মানবোধ এবং পারিবারিক যোগাযোগের ঘাটতি অনেক সময় এমন অপ্রতিরোধ্য ট্র্যাজেডি ডেকে আনে।
পুঠিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফরিদুল ইসলাম জানান, এ ঘটনায় থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা দায়ের করা হয়েছে। নিহতের মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পেলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে।
সামান্য একটি সন্দেহের জেরে তরতাজা এক কিশোরের জীবনাবসান কেবল একটি পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতিই নয়, বরং সমাজ ও অভিভাবকদের জন্য এটি একটি বড় সতর্কবার্তা—শিশুদের মানসিক চাপ ও আবেগকে গুরুত্ব দেওয়ার বিকল্প নেই।
মতামত