ঢাকা    বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬, ১২ আষাঢ় ১৪৩৩
আর এন টিভি বিডি

বেইজিং চাউমিং রেলওয়ে স্টেশনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে অভ্যর্থনা জানান চীনের কাস্টমস মন্ত্রী সান মেইজুন

নিজস্ব প্রতিবেদক, বেইজিং (চীন) থেকেবিদেশ সফরের অংশ হিসেবে বর্তমানে চীন সফরে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি গত সোমবার মালয়েশিয়া থেকে চীনের দালিয়ানে আসার পর থেকেই ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। ২৩ থেকে ২৬ জুন পর্যন্ত নির্ধারিত এই চার দিনের সরকারি সফরটি বাংলাদেশ ও চীনের কূটনৈতিক এবং অর্থনৈতিক সম্পর্কে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর চলমান সফরে মূলত যে সমস্ত বিষয় এবং এজেন্ডা গুরুত্ব পাচ্ছে, তার মধ্যে রয়েছে- চীনের প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর সাথে বৈঠক, ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের চেয়ারম্যানের সাথে বৈঠক, বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি এবং বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি স্থানান্তর ইত্যাদি। প্রাধনমন্ত্রীর সাথে কাজাখস্তানের প্রধানমন্ত্রীর সৌজন্য সাক্ষাৎ তারেক রহমানের সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন কাজাখস্তানের প্রধানমন্ত্রী ওলজাস বেকতেনভ। বুধবার চীনের দালিয়ানে স্থানীয় সময় সকাল ১০টা ১৫ মিনিটে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) ‘গ্রীষ্মকালীন দাভোস’র সাইডলাইনে এই সৌজন্য সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কাজাখস্তানের সাথে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরো জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী ঢাকা ও আস্তানায় স্থায়ী কূটনৈতিক মিশন স্থাপনের বিষয়ে একমত হন। এ ছাড়া রাজনৈতিক, ব্যবসায়িক এবং জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধির জন্য নিয়মিত বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়া উচিত বলে মত দেন তারা। কাজাখস্তানের প্রধানমন্ত্রী ওলজাস বেকতেনভ উভয় দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বৃহত্তর সম্পৃক্ততার সম্ভাবনাকে ইতিবাচকভাবে দেখেন। বৈঠকে বাংলাদেশ থেকে কাজাখস্তানে দক্ষ শ্রমিক পাঠানো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ডিজিটাল অবকাঠামো, প্রযুক্তি, কৃষি, ব্যবসা এবং খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতে দুই দেশের বাণিজ্য সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হয়। এ ছাড়া পানি কূটনীতি নিয়ে জাতিসঙ্ঘের অধীনে একটি বিশেষায়িত সংস্থা প্রতিষ্ঠার কাজাখস্তানের প্রস্তাবে বাংলাদেশের সমর্থন প্রত্যাশা করেন প্রধানমন্ত্রী। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী এতে বাংলাদেশের সমর্থন রয়েছে বলে জানান। বেইজিংয়ে লালগালিচা সংবর্ধনাপ্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীনের রাজধানী বেইজিং পৌঁছান বুধবার চীনের স্থানীয় সময় দুপুর ২টায়। দালিয়ান থেকে হাই-স্পিড (বুলেট) ট্রেনে করে বিকেল ৫টা ৩৫ মিনিটে বেইজিং পৌঁছান তিনি ও তার সফরসঙ্গীরা। হাই স্পিড ট্রেনে বেইজিং চাউমিং রেলওয়ে স্টেশনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে অভ্যর্থনা জানান চীনের কাস্টমস মন্ত্রী (জেনারেল এডমিনিস্ট্রেশন অব কাস্টমস) সান মেইজুন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও জুবাইদা রহমান লালগালিচা দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময়ে চীনের একটি সুসজ্জিত দল গার্ড অব অনার প্রদান করে। দালিয়ান রেলওয়ে স্টেশন থেকে হাইস্পিড ট্রেন (বুলেট ট্রেন) চড়ে বেইজিং আসেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, সহধর্মিণী ডা: জুবাইদা রহমানসহ পররাষ্ট্র মন্ত্রী খলিলুর রহমান, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন, প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা একেএম শামসুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমানসহ তার সফরসঙ্গীরা। প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন জানান, প্রধানমন্ত্রী এই সফরের সময়ে বেইজিংয়ে ‘দিয়াওইতই’ রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবনে থাকবেন। এর আগে, চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কুয়াংয়ের আমন্ত্রণে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী চার দিনের সফরে প্রথমে গত সোমবার রাতে দালিয়ান আসেন। সোমবার তিনি ওয়ার্ল্ড ইকোনমি ফোরামের বার্ষিক সম্মেলনে যোগ দেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাষ্ট্রীয় সফরের আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি শুরু হবে বৃহস্পতিবার সকাল থেকে। বেইজিংয়ের গ্রেট হলে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে আনুষ্ঠানিকভাবে অভ্যর্থনা জানাবেন চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কুয়াং। তার আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্থানীয় সময় সকাল ১০টায় দালিয়ানে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম (ডব্লিউইএফ) আয়োজিত ‘গ্রীষ্মকালীন দাভোস’-এর বার্ষিক সম্মেলনে অংশ নেন। চীনের ডালিয়ান আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে এটি অনুষ্ঠিত হয়। ১৭তম অ্যানুয়াল মিটিং অব দ্য নিউ চ্যাম্পিয়নসের এই আয়োজনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, গিনির প্রধানমন্ত্রী আমাদু উরি বাহ, কাজাখস্তানের প্রধানমন্ত্রী ওলঝাস বেকতেনভ, দক্ষিণ কোরিয়ার প্রধানমন্ত্রী কিম মিন সেওক, মঙ্গোলিয়ার প্রধানমন্ত্রী নিয়াম ওসর উচরাল এবং মন্টিনিগ্রোর প্রধানমন্ত্রী মিলোইকো স্পাইজিচ অংশ নেন। সম্মেলনটিতে ৯০টিরও বেশি দেশ ও অঞ্চল থেকে রাজনৈতিক, ব্যবসায়িক, শিক্ষাবিদ এবং গণমাধ্যম অঙ্গনের ১,৭০০ জনেরও অধিক প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করেন। সামার দাভোস বা ‘গ্রীষ্মকালীন দাভোসে’ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অংশগ্রহণ বাংলাদেশের জন্য একদিকে নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণ, অন্যদিকে বিভিন্ন দেশের সেরা অনুশীলন ও অভিজ্ঞতা গ্রহণের মাধ্যমে জাতীয় সক্ষমতাকে আরো সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী করবে। শীর্ষ নেতাদের সাথে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকপ্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের মূল আকর্ষণ হচ্ছে- তিনি বেইজিংয়ে চীনের শীর্ষ নেতৃত্বের সাথে আনুষ্ঠানিক বৈঠকে অংশ নিচ্ছেন। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাথে শুক্রবার একান্ত বৈঠক করবেন তারেক রহমান। ওই বৈঠকে দুই দেশের কৌশলগত অংশীদারিত্ব আরো গভীর করার বিষয়ে আলোচনা হবে। এ ছাড়া বৃহস্পতিবার চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াংয়ের সাথে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন তারেক রহমান। চীনের প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে আয়োজিত এই সফরে দুই দেশের সরকারপ্রধান পর্যায়ের বৈঠকে বাণিজ্য ঘাটতি কমানো, মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) এবং বড় অবকাঠামো প্রকল্পে অর্থায়নের বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে। এরপর ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের (এনসিসি) চেয়ারম্যান ঝাও লেজি-এর সাথে বৈঠক করবেন প্রধানমন্ত্রী। চীনের শীর্ষ আইনপ্রণেতার সাথেও প্রধানমন্ত্রীর সৌজন্য সাক্ষাতের কথা রয়েছে। বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিসংশ্লিষ্টরা বলছেন, চীন বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ আমদানিকারক দেশ। তবে দুই দেশের মধ্যে বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সফরে বাণিজ্য ভারসাম্য বজায় রাখতে এবং বাংলাদেশী পণ্যের শুল্কমুক্ত সুবিধা আরো বাড়ানোর বিষয়ে জোর দেয়া হচ্ছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে একটি সম্ভাবনাময় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) স্বাক্ষরের লক্ষ্য নিয়ে আলোচনা অনেক দূর এগিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি স্থানান্তরবাংলাদেশী ব্যবসায়ী মহল এবং সরকারের নীতিনির্ধারকদের মতে, এবারের সফরের অন্যতম মূল এজেন্ডা হলো চীনের প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ বাংলাদেশে নিয়ে আসা। তবে ডিজিটাল অর্থনীতি ও প্রযুক্তি তথা চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় চীনের উন্নত প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং ডিজিটাল অবকাঠামো খাতে বাংলাদেশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বিশেষ চুক্তি হতে পারে। বাংলাদেশের পোশাক খাতের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও টেক্সটাইল ইনপুটের একটি বড় অংশ চীন থেকে আসে। এই খাতে সরাসরি চীনা বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

বেইজিং চাউমিং রেলওয়ে স্টেশনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে অভ্যর্থনা জানান চীনের কাস্টমস মন্ত্রী  সান মেইজুন