স্টাফ রিপোর্টার: কুড়িগ্রাম
হাসান মাহমুদ জয়
অপারেশন থিয়েটারে ভুল অ্যানেস্থেসিয়া প্রয়োগ এবং পরবর্তী সময়ে অব্যবস্থাপনার কারণে না ফেরার দেশে পাড়ি জমালেন জুলাই বিপ্লবের অন্যতম সাহসী যোদ্ধা শাহজামাল (আঙ্গুর)। গত ৫ জুলাই ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। কিন্তু তার এই চলে যাওয়া শুধু একটি মৃত্যু নয়, এটি যেন একটি পরিবারের ধ্বংস ও অনাগত সন্তানের অকাল পিতৃহারার এক মর্মান্তিক উপাখ্যান।
শাহজামালের ব্যক্তিগত জীবনের গল্পটা বড়ই বেদনার। তার সহধর্মিণী এখন আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা। অথচ বাবার কাঁধ ছোঁয়ার আগেই অনাগত সন্তান হারালো তার বাবাকে। পৃথিবীতে চোখ খোলার আগেই শাহজামালের সন্তান বঞ্চিত হলো পিতৃস্নেহ থেকে। এই নির্মম সত্য যেন কোনোভাবেই মানতে পারছেন না পরিবারের সদস্যরা।
মরহুমের বড় ভাই সম্রাট আহাজারি করে বলেন, "আমি আমার ভাইয়ের জীবন বাঁচাতে সাধ্যমতো সবটুকু চেষ্টা করেছি। এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকা পর্যন্ত নিয়ে গিয়েছি, চিকিৎসার পেছনে ৫-৬ লক্ষাধিক টাকা ব্যয় করেছি। অনেক জায়গায় যোগাযোগ করেছি, কিন্তু চিকিৎসকদের চরম গাফিলতি আর সময়ের অপচয়ের কারণে আমি আমার ভাইটিকে আর ফিরাতে পারলাম না। চিকিৎসার নামে এই অবহেলা আমার পুরো পরিবারকে শেষ করে দিল।"
স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে শাহজামালের বাবা বলেন, "আমার ছেলে একদম সুস্থ ছিল। সকালে আমার সাথে কথা বলে হাসিমুখে অপারেশন থিয়েটারে প্রবেশ করল। আর দুপুর ১টায় তাকে বের করা হলো অচেতন অবস্থায়। সুস্থ মানুষটির এই কী পরিণতি হলো?"
শাহজামালের বন্ধু ও সহযোদ্ধা আহসান হাবীব ক্ষোভের সাথে জানান, "ঢাকা নেওয়ার পর চিকিৎসকরা জানান তার কিডনি, লিভার ও মস্তিষ্কে মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে। অপারেশনের আগের ফুল বডি চেকআপে কি কিছুই ধরা পড়েনি? নাকি অবহেলার কারণে সব অকেজো হয়ে গেছে? আমরা এর স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত চাই।"
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সহযোদ্ধা সাজ্জাদ হোসেন বলেন, "শাহজামাল আমাদের আন্দোলনের এক নির্ভীক যোদ্ধা। তাকে হারিয়ে আমরা আজ শোকে স্তব্ধ। অপারেশন থিয়েটারে অ্যানেস্থেসিয়া প্রয়োগে ভুল, চিকিৎসকের অসতর্কতা এবং হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের গাফিলতিই এই মৃত্যুর জন্য সরাসরি দায়ী। আমরা এর পেছনে জড়িতদের অবিলম্বে বিচারের আওতায় আনার জোর দাবি জানাই।"
পরিবার ও সহযোদ্ধারা প্রশাসনের নিকট দাবি জানিয়েছেন, একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে এই ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদঘাটন করা হোক। চিকিৎসা খাতের এমন অব্যবস্থাপনা যেন আর কোনো অন্তঃসত্ত্বার কপাল না পোড়ায়, বা আর কোনো সন্তানকে অকালে পিতৃহারা না করে, সেজন্য জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন তারা।
একজন সম্ভাবনাময় তরুণ যোদ্ধার এমন করুণ প্রস্থান এবং তার অনাগত সন্তানের পিতৃবিয়োগে পুরো এলাকায় শোকের মাতম চলছে। আমরা শাহজামালের শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাই এবং ঘটনার দ্রুত ন্যায়বিচার কামনা করছি।